মাদারীপুরে জাতীয় নাগরিক পার্টি, (এনসিপি)র জেলা কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে মনিরুল ইসলাম ভুঁইয়ার নাম ঘোষণার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা।

স্থানীয় রাজনীতিতে তিনি সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা শাহজাহান খানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত, এমন দাবি ও আলোচনা দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। ফলে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রত্যাশা করা মানুষের কাছে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে,

এনসিপি আসলে কোন ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিনিধিত্ব করতে চাইছে?

প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়েছে সাম্প্রতিক কিছু রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সামাজিক উপস্থিতিকে ঘিরে। অভিযোগ রয়েছে, মাত্র কয়েকদিন আগে মনিরুল ইসলাম ভুঁইয়ার বিলাসবহুল গাড়িতে করে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীর দীর্ঘ ভ্রমণের বিষয়টি সামনে এসেছে।

একটি ছবি, একটি গাড়ি কিংবা একটি ব্যক্তিগত যোগাযোগ অবশ্যই কারও রাজনৈতিক পরিচয় বা অপরাধের প্রমাণ নয়। কিন্তু রাজনীতি কেবল আইনি প্রমাণের হিসাবেই চলে না; রাজনীতিতে প্রতীক, সম্পর্ক এবং জনমনে তৈরি হওয়া বার্তাও গুরুত্বপূর্ণ।

জুলাইয়ের আন্দোলনের অন্যতম বড় দাবি ছিল পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসান। দলীয় পৃষ্ঠপোষকতা, ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি, সুবিধাবাদী রাজনৈতিক পুনর্বাসন—এসবের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই তো নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল।

 তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে,

যাদের রাজনৈতিক অতীত আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগে আলোচিত, তাদেরই যদি নতুন রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে সেই পরিবর্তনের সীমারেখা কোথায়?

এনসিপির নেতৃত্বের কাছে তাই ব্যাখ্যা প্রত্যাশিত।

মাদারীপুরের এই নিয়োগ কি স্থানীয় বাস্তবতার কারণে নেওয়া একটি সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত? নাকি পুরোনো রাজনৈতিক নেটওয়ার্ককে নতুন ব্যানারে অন্তর্ভুক্ত করার কৌশল?

কারও অতীত রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেই তিনি চিরদিনের জন্য অযোগ্য এমন সরল সিদ্ধান্তও গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে গ্রহণযোগ্য নয়। মানুষ রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে, নতুন দলে যোগ দিতে পারে, এমনকি অতীত ভুলের জন্য রাজনৈতিকভাবে নিজেদের পুনর্গঠনও করতে পারে।

কিন্তু সেক্ষেত্রে প্রয়োজন স্বচ্ছতা।

কোন প্রক্রিয়ায় তাকে জেলা আহ্বায়ক করা হলো?

তার অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা কি যাচাই করা হয়েছে?

স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতামত নেওয়া হয়েছে কি?

জুলাইয়ের আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষের কাছে এই নিয়োগের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা কী?

এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে যদি শুধু বলা হয়, "এটাই নতুন রাজনীতি”, তাহলে মানুষের সন্দেহ আরও বাড়বে।

কারণ নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো, পুরোনো মুখকে নতুন পোষ্টার দেয়া নয়, বরং পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসা!

 এনসিপি যদি সত্যিই জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করতে চায়, তাহলে তাদের সবচেয়ে বেশি সতর্ক হতে হবে ক্ষমতার পুরোনো বলয়ের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে।

নইলে সমালোচকরা প্রশ্ন তুলবেই,

জুলাই কি সত্যিই নতুন রাজনীতির জন্ম দিয়েছে, নাকি পুরোনো রাজনীতির পাহারাদারদের শুধু নতুন ব্যানার দেওয়া হচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর এনসিপিকেই দিতে হবে।

 কারণ ইতিহাসের এই সময়ে জনগণ শুধু নতুন দলের নাম চায় না, তারা নতুন রাজনৈতিক চরিত্র দেখতে চায়।